হাইল হাওরের পাড় থেকে জাতীয় দলের মাঠে: সুফিলের ছুটে চলার গল্প

​”শুরুটা হয়েছিল শ্রীমঙ্গলের এক টুকরো সবুজ মাঠ আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে। তখন তো আর ভাবিনি একদিন দেশের লাখো মানুষের সামনে জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামব। শুধু বলের পেছনে ছোটার আনন্দটাই ছিল আসল। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, শ্রীমঙ্গলের ধুলোমাখা মাঠ আর ইকরামুর রহমান রানা স্যারের মতো কোচের দিকনির্দেশনা না থাকলে আজকের এই সুফিল হয়তো তৈরিই হতো না।”
​— মাহবুবুর রহমান সুফিল ।
May be an image of football, soccer and text
​শ্রীমঙ্গলের পশ্চিম ভাড়াউড়া সবুজে ঘেরা ছোট্ট এক জনপদ। এই জনপদের মাঠেই একদিন বল পায়ে ছুটতেন এক কিশোর। তখন তাঁর দৌড়ের গন্তব্য ছিল না জাতীয় দলের জার্সি, ছিল না বড় কোনো স্টেডিয়াম। ছিল শুধু ফুটবল আর খেলার আনন্দ।
​তবে সেই স্বপ্নসাধ ও শেখার শুরুটা হয়েছিল শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে। আর এই পথচলায় তাঁর মেন্টর ও পথপ্রদর্শক ছিলেন শ্রীমঙ্গল ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও কোচ, সাবেক জাতীয় ফুটবলার মো. ইকরামুর রহমান রানা। তাঁর হাত ধরেই ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ ও দীক্ষা পেয়েছিলেন কিশোর সুফিল।
​সময় গড়িয়েছে। সেই দৌড় থামেনি। বরং গ্রামের মাঠ পেরিয়ে তা পৌঁছেছে ঢাকার বড় ক্লাবে, জাতীয় দলের অনুশীলন মাঠে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে।  নাম তাঁর মাহবুবুর রহমান সুফিল।
​শ্রীমঙ্গলের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের এই তরুণ এখন বাংলাদেশের ফুটবলে পরিচিত একটি নাম। গতি তাঁর বড় অস্ত্র। বল পায়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে সামনে ছুটে যাওয়ার দৃশ্য তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকেই গোল করেছেন। খেলেছেন দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর হয়ে। পেয়েছেন ঘরোয়া শিরোপা, আন্তর্জাতিক পদকের স্বাদও।
​কিন্তু সুফিলের গল্প শুধু সাফল্যের নয়। এই গল্পের শুরু একটি গ্রাম থেকে, একটি ভিক্টোরিয়া স্কুলের মাঠ থেকে।
​যে গ্রামে তাঁর শেকড়
​১৯৯৯ ইং সালের ১০ সেপ্টেম্বর। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর সদর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামে জন্ম মাহবুবুর রহমান সুফিলের।
​বাবা মো : জতরিক মিয়া, মা মোছা: নবরুণ বেগম। চার ভাই ও চার বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি।
​গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুফিলের ছোটবেলার অন্যতম সঙ্গী ছিল ফুটবল। শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের ঘাস আর ধুলোবালি মেখেই তাঁর ফুটবল পায়ে ছুটে চলা। সেই মাঠে বল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতেই তৈরি হয় খেলার প্রতি গভীর ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা একসময় তাঁকে নিয়ে যায় পেশাদার ফুটবলের জগতে।
​গতিই যেখানে পরিচয়
​একজন ফরোয়ার্ডের জন্য গতি বড় অস্ত্র। সুফিলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়।
​২০১৮ সালের জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় ৩২.০৪ কিলোমিটার গতি তুলেছিলেন তিনি। সেই গতি তাঁকে দেশের দ্রুতগতির ফুটবলারদের মধ্যে আলোচনায় নিয়ে আসে।
​মাঠে সুফিলকে দেখলে বোঝা যায়, কেন গতি তাঁর খেলার এত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বল সামনে পেলেই দ্রুত এগিয়ে যাওয়া, ডিফেন্ডারের সঙ্গে দৌড়ের লড়াই এবং সুযোগ পেলে সরাসরি গোলমুখে আক্রমণ—এসবই তাঁর খেলার বৈশিষ্ট্য। ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে ‘স্পিড অ্যাটাক’, সুফিল যেন তারই এক পরিচিত মুখ।
​১৯ বছর বয়সেই নেতৃত্ব
​সুফিলের ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের হয়ে।
​২০১৭-১৮ মৌসুমে মাত্র ১৯ বছর বয়সে দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান তিনি। বয়সে তরুণ, কিন্তু দায়িত্বে বড়। সেই মৌসুমেই আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা কাপের শিরোপা জেতে।
​তরুণ সুফিলের ক্যারিয়ারে এটি ছিল বড় একটি অর্জন। ক্লাব ফুটবলে নিজের সামর্থ্য দেখানোর পাশাপাশি তখনই তিনি জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচকদের নজরে আসতে শুরু করেন।
​অভিষেকেই গোল
​২০১৮ সাল। লাওসের বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক মাহবুবুর রহমান সুফিলের। অভিষেক ম্যাচেই গোল!
​একজন তরুণ ফুটবলারের জন্য জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামাটাই যেখানে বড় স্বপ্ন, সেখানে প্রথম ম্যাচেই গোল করা ছিল বিশেষ এক প্রাপ্তি। এরপর জাতীয় দলের হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেন তিনি। নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দলের বিপক্ষে খেলেছেন। পাশাপাশি কাতার, আফগানিস্তান ও ওমানের মতো দলের বিপক্ষেও আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর।
​নেপালের বিপক্ষে সেই দৌড়
​২০২০ সালে নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ। মাঝমাঠের কাছাকাছি জায়গা থেকে বল নিয়ন্ত্রণ করেন সুফিল। এরপর শুরু তাঁর বিখ্যাত সেই দৌড়।
​সামনে প্রতিপক্ষের রক্ষণ। পেছনে একাধিক খেলোয়াড়। কিন্তু সুফিল থামেননি। গতির সঙ্গে বল নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে গোল করেন তিনি। সেই গোলটি তাঁর ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে। একই সঙ্গে ফুটবলপ্রেমীদের সামনে আবারও স্পষ্ট হয়—সুফিলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর গতি।
​বসুন্ধরা কিংসের মঞ্চে
​আরামবাগে নিজের সামর্থ্যের জানান দেওয়ার পর সুফিলের সামনে খুলে যায় আরও বড় দরজা।
​দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের হয়ে খেলেন একাধিক মৌসুম। ঘরোয়া ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পান তিনি। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ঘরোয়া ফুটবলের একাধিক শিরোপার স্বাদও পেয়েছেন।
​পরে ঢাকা মোহামেডান ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের জার্সিতেও মাঠে দেখা গেছে তাঁকে। একটি গ্রামের মাঠ থেকে শুরু হওয়া যাত্রা এভাবেই পৌঁছেছে দেশের বড় ক্লাবগুলোর ড্রেসিংরুমে।
​জাতীয় দলের পাশাপাশি এসএ গেমস
​২০১৯ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ফুটবল দলের অংশ ছিলেন সুফিল। সেবার বাংলাদেশ দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে।
​আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের হয়ে একটি পদক জয় তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি। একজন খেলোয়াড়ের জন্য আন্তর্জাতিক পদক মানে শুধু একটি মেডেল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব, দলের জন্য লড়াই এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল।
​
ফুটবলার ও ক্রিকেটারের সংসার
​মাঠের বাইরে সুফিলের জীবনেও রয়েছে ক্রীড়াঙ্গনের গল্প।
​বিকেএসপির পরিচিত পরিবেশে নারী ক্রিকেটার জিন্নাত আছিয়া অর্থীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। পরিচয় থেকে সম্পর্ক, এরপর বিয়ে। ২০২০ সালে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা।
​একজন ফুটবলার, অন্যজন ক্রিকেটার—দেশের দুই জনপ্রিয় খেলার দুই অঙ্গনের এই জুটি স্বাভাবিকভাবেই ক্রীড়ামহলে আলোচনার জন্ম দেয়। মাঠে তাঁরা আলাদা খেলায় লড়েছেন। কিন্তু জীবনের মাঠে এখন একই পথের সঙ্গী।

⚽ সুফিল — এক নজরে

🏷️ বিষয় 📋 তথ্য
👤 নাম মাহবুবুর রহমান সুফিল
🎂 জন্ম ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯
📍 গ্রাম পশ্চিম ভাড়াউড়া, শ্রীমঙ্গল
👨 বাবা মো: জতরিক মিয়া
👩 মা মোছা: নবরুণ বেগম
👨‍👩‍👧‍👦 ভাই-বোন ৪ ভাই, ৪ বোন
⚽ প্রাথমিক দীক্ষা শ্রীমঙ্গল ফুটবল একাডেমি ও শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ
🇧🇩 জাতীয় দলে অভিষেক ২০১৮
🥅 অভিষেক গোল লাওসের বিপক্ষে
🚀 সর্বোচ্চ আলোচিত গতি ৩২.০৪ কিমি/ঘণ্টা
🏆 উল্লেখযোগ্য ক্লাব আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ • বসুন্ধরা কিংস • ঢাকা মোহামেডান • ব্রাদার্স ইউনিয়ন
🥉 আন্তর্জাতিক অর্জন ২০১৯ এসএ গেমসে ব্রোঞ্জ
​
গ্রামের ছেলেটি এখন অনুপ্রেরণা
​পশ্চিম ভাড়াউড়ার সেই মাঠ কিংবা শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ হয়তো আজও আছে। সেখানে আজও বিকেলে কিশোরেরা স্বপ্ন দেখে ফুটবল তারকা হওয়ার। সেই কিশোরদের চোখে মাহবুবুর রহমান সুফিল কেবল একজন সফল ফুটবলার নন, তিনি গ্রাম বাংলার মাটি থেকে উঠে এসে জাতীয় মঞ্চে নিজের নাম লেখার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *