মো. কামাল উদ্দিন: শ্রেণিকক্ষ থেকে ডিজিটাল শিক্ষা—এক নিরলস শিক্ষকের পথচলার গল্প।
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ—এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন মো. কামাল উদ্দিন। গণিতের শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। বর্তমানে তিনি শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁর কাছে একজন শিক্ষকের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজ ও দেশের জন্য অবদান রাখবে—এটাই তাঁর কাছে শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যই যেন শিক্ষক কামাল উদ্দিনের দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
শৈশব থেকে শিক্ষার পথে
মো. কামাল উদ্দিনের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭২ইং, শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও এলাকার লাহারপুর (দিঘীরপাড়) গ্রামে। তাঁর পিতা মো. সুলতান আহমদ এবং মাতা মোছা. শামসুন্নাহার বেগম চৌধুরী।
শিক্ষাজীবনের শুরু খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর আছিদ উল্লা উচ্চ বিদ্যালয়, ভোজপুর, শ্রীমঙ্গল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১৯৯১ ইং সালে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে গণিত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে গণিতে অনার্স এবং ১৯৯৬ সালে গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। শিক্ষাকে আরও গভীরভাবে বোঝার আগ্রহ তাঁকে পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ২০১০ সালে এমএড পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন।
শিক্ষকতার শুরু, পথচলার বিস্তার
শিক্ষকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শুরু হওয়ার আগে তিনি সিলেট পুলিশ লাইন্স উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ মাস শিক্ষকতা করেন। পরে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে ছাতক উপজেলায় প্রায় পাঁচ মাস দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার পর ওই দুটি চাকরি ছেড়ে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষায় স্থায়ীভাবে যুক্ত হন। ২০০২ সালে জকিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জকিগঞ্জে সরকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
দীর্ঘ পেশাগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। পেশাগত প্রশিক্ষণে বিমান বাংলাদেশ-এর সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হওয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট অর্জন করেন।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় আলাদা পরিচয়
প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রযুক্তিকে শিক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন কামাল উদ্দিন। বগুড়া নট্রামস থেকে এক মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে আউটস্ট্যান্ডিং ফলাফল অর্জন করেন এবং পদক লাভ করেন।
শুধু নিজের দক্ষতা অর্জনেই তিনি থেমে থাকেননি। শিক্ষক বাতায়নের মাধ্যমে একের পর এক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। সরকারি শিক্ষক বাতায়ন থেকে ২৬টি কোর্স সম্পন্ন করেছেন তিনি। পাশাপাশি সেখানে তাঁর ৫০টির বেশি শিক্ষামূলক কনটেন্ট রয়েছে, যেগুলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য।
ডিজিটাল শিক্ষার এই পথচলায় তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ‘SMK Education’। শিক্ষা বিষয়ক এই চ্যানেলে রয়েছে ২০০টির বেশি ক্লাস ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট। শ্রেণিকক্ষের পাঠকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও সহজ, আকর্ষণীয় ও সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব কনটেন্ট তৈরি করছেন তিনি।
জাতীয় স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ
ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণে তাঁর দক্ষতা জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৯ সালে তিনি জাতীয়ভাবে দেশসেরা কনটেন্ট নির্মাতা নির্বাচিত হন।
একই বছর ফিলিপাইনে ILC-এর মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে ১৪ দিনের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষকদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির ব্যবহার আরও কার্যকর করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
২০২০ সাল থেকে তিনি মৌলভীবাজার জেলা অ্যাম্বাসাডর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত হন কামাল উদ্দিন।
তবে পুরস্কার বা পদককে নিজের সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি মনে করেন না তিনি। তাঁর কাছে একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় শিক্ষার্থীদের জীবনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
শিক্ষার্থীর সাফল্যই সবচেয়ে বড় পুরস্কার
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজারো শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন কামাল উদ্দিন। তাঁদের অনেকেই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫-৬ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা করে অনেকেই চিকিৎসক হয়েছেন। অনেকে বিসিএস ক্যাডার হয়ে সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন প্রকৌশলী, দুজন আর্মি অফিসার এবং একজন নেভি অফিসারও রয়েছেন।
এ ছাড়া তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অগণিত শিক্ষার্থী শিক্ষকতা করছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর দুজন সাবেক শিক্ষার্থী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন বলে তিনি জানান।
দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট অঙ্গনেও তাঁর শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসন, প্রকৌশল, সামরিক বাহিনী, করপোরেটসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে আছে।
একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে—প্রশ্নটি যেন নিজের কাজ দিয়েই উত্তর দেন কামাল উদ্দিন।
“শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাতে বদ্ধপরিকর”
বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাঁর ভাবনায় শিক্ষা মানে শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করা নয়। শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে শেখানো, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানো, সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ তৈরি করা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
তাই তাঁর উচ্চারণ—‘শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাতে বদ্ধপরিকর।’
শ্রীমঙ্গলের লাহারপুরের এক শিক্ষার্থী থেকে গণিতের শিক্ষক, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, প্রশিক্ষক এবং আজকের বিদ্যালয়প্রধান—কামাল উদ্দিনের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন শিক্ষকের বদলে দেওয়ার ক্ষমতার গল্প।
সময়ের সঙ্গে শিক্ষার ধরন বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে প্রযুক্তি, বদলাচ্ছে শিক্ষার্থীদের চাহিদা। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পথ তৈরি করাই তাঁর লক্ষ্য।
হয়তো এ কারণেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদবি, পুরস্কার কিংবা জাতীয় স্বীকৃতি নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী, যারা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলো ছড়াচ্ছে।
লেখক :মোহাম্মদ সুমন