প্রবীণ সাংবাদিক গোপাল দেব চৌধুরী—একটি সময়ের নাম, একটি ইতিহাসের অধ্যায়
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া কর্ম, আদর্শ ও স্মৃতি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। সময়ের স্রোত তাঁদের দৃশ্যমান উপস্থিতি মুছে দিতে পারে, কিন্তু তাঁদের অবদান মুছে দিতে পারে না। শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা, সামাজিক অঙ্গন ও জনসম্পৃক্ততার ইতিহাসে তেমনই এক উজ্জ্বল নাম প্রবীণ সাংবাদিক গোপাল দেব চৌধুরী।
চা-বাগানের সবুজে ঘেরা, পাহাড়ের ছায়ায় বেড়ে ওঠা শ্রীমঙ্গলের সংবাদজগতে তিনি ছিলেন শুধু একজন সাংবাদিক নন—ছিলেন একজন অভিভাবক, সংগঠক, সম্পাদক, শিক্ষক ও সমাজহিতৈষী। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে পরিণত করেছিল শ্রীমঙ্গলের সর্বস্তরের মানুষের আপনজনে।
শেকড়ের গভীরে যার পথচলা
শ্রীমঙ্গলের ধানসিঁড়ি আবাসিক এলাকার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা গোপাল দেব চৌধুরীর। তিনি ছিলেন সমাজসেবক স্বর্গীয় রাধানাথ দেব চৌধুরীর নাতি এবং প্রয়াত পুলিন বিহারী দেব চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র।
শৈশব থেকেই পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও মানবিকতার আবহে গড়ে ওঠেন তিনি। জীবনের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন শিক্ষার সঙ্গে। শ্রীমঙ্গলের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
শ্রেণিকক্ষে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি; শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শিক্ষকতার সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার ভিতকে আরও শক্তিশালী করে।
শিক্ষক থেকে হয়ে উঠলেন ‘সংবাদ পুরুষ’
সময় তাঁকে নিয়ে যায় আরেক বৃহত্তর পরিসরে। মানুষের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে তিনি যুক্ত হন সাংবাদিকতায়।
চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষের জীবন, স্থানীয় মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা, সামাজিক অসঙ্গতি, উন্নয়ন ও শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য—সবকিছুই তাঁর সাংবাদিকতার বিষয় হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কখনোই কেবল পেশা ছিল না; বরং ছিল মানুষের কথা বলার একটি দায়িত্ব।
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। সহকর্মীদের আস্থা ও ভালোবাসায় তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি শুধু সংগঠনের নেতৃত্বই দেননি, বরং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য হয়ে উঠেছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের গুরুত্ব, মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়টি তিনি তরুণ সাংবাদিকদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন।
‘চায়ের দেশ’—স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার গল্প
২০০৪ সালের ২৫ জুলাই গোপাল দেব চৌধুরীর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘চায়ের দেশ’।
পত্রিকাটি হয়ে ওঠে শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় মানুষের কথা বলার অন্যতম একটি প্ল্যাটফর্ম। চা-বাগান, পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ, ব্যবসা, রাজনীতি ও জনজীবনের নানা বিষয় উঠে আসত এর পাতায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে গোপাল দেব চৌধুরী শুধু একটি পত্রিকা প্রকাশ করেননি; তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সাংবাদিকতার পরিবার। তাঁর স্নেহ ও পরামর্শে অনেক তরুণ সাংবাদিক সংবাদ লেখার হাতেখড়ি পেয়েছেন।
‘চায়ের দেশ’ তাই শুধু একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম নয়—শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সাংবাদিকতার বাইরে বিস্তৃত ছিল তাঁর কর্মপরিধি
গোপাল দেব চৌধুরীর পরিচয় সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
শ্রীমঙ্গল রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে তিনি সমাজসেবা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
শ্রীমঙ্গল ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হিসেবেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যবসায়ী সমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
জনকল্যাণের ক্ষেত্রেও তাঁর পারিবারিক অবদান স্মরণীয়। সাধারণ মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁর পরিবার শ্রীমঙ্গল পৌর শ্মশানের জন্য জমি দান করে—যা তাঁদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মানুষের সংকটে সামনে থাকতেন
সমাজের যেকোনো সংকট কিংবা জনস্বার্থের প্রশ্নে গোপাল দেব চৌধুরীর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের প্রতি দায়িত্ব শুধু বক্তৃতায় নয়—কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।
এই কারণেই সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু ব্যবহারে ছিল আন্তরিকতা। মতের পার্থক্য থাকলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
তরুণ সাংবাদিকদের কাছে ছিলেন বটবৃক্ষ
একজন প্রবীণ সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তাঁর লেখা সংবাদ নয়, বরং তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে কতজন নতুন মানুষ সামনে এগিয়ে গেলেন—তার মধ্যে।
গোপাল দেব চৌধুরী ছিলেন সেই অর্থে একজন অভিভাবক সাংবাদিক।
তরুণদের ভুল ধরিয়ে দিতেন, সংবাদ লেখার কৌশল শেখাতেন, তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব বোঝাতেন। সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি একজন সাংবাদিকের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দিতেন।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাই শুধু ‘চায়ের দেশ’ নয়; তাঁর হাতে তৈরি ও অনুপ্রাণিত সাংবাদিকদের একটি প্রজন্মও।
পরিবারে ছিলেন নির্ভরতার ছায়া
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল মানুষ। স্ত্রী ইলা দেব চৌধুরী এবং দুই পুত্র সুমন দেব চৌধুরী ও সনেট দেব চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর পারিবারিক জীবন ছিল ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ।
সামাজিক অঙ্গনে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মানুষ হলেও পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল অভিভাবক—একটি বটবৃক্ষের মতো, যার ছায়ায় আপনজনেরা খুঁজে পেতেন নিরাপত্তা ও নির্ভরতা।
একটি মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সময়
গোপাল দেব চৌধুরীর জীবনকে শুধু একজন সাংবাদিকের জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর কর্মপরিধির অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যাবে।
তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সাংবাদিক, সম্পাদক, সংগঠক, সমাজসেবী ও অভিভাবক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন শ্রীমঙ্গলের সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে কোথাও না কোথাও যুক্ত।
সময়ের সঙ্গে শ্রীমঙ্গল বদলেছে। বদলেছে সংবাদমাধ্যমের ধরন, প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে সাংবাদিকতার ভাষা। কিন্তু একজন সাংবাদিকের মৌলিক দায়িত্ব—সত্যকে তুলে ধরা, মানুষের কথা বলা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা—এই মূল্যবোধ কখনো পুরোনো হয় না।
স্মৃতির পাতায় তিনি অমলিন
আজ তিনি দৃশ্যমান জগতে না থাকলেও তাঁর কর্মের ছাপ শ্রীমঙ্গলের মাটি, মানুষের স্মৃতি এবং সাংবাদিকতার ইতিহাসে রয়ে গেছে।
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের দীর্ঘ নেতৃত্ব, ‘চায়ের দেশ’-এর পথচলা, অসংখ্য তরুণ সাংবাদিককে উৎসাহ দেওয়া, শিক্ষা ও সমাজসেবায় ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়ে গোপাল দেব চৌধুরী কেবল একটি নাম নন; তিনি শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি।
মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়—কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম থেকে যায় ইতিহাস হয়ে।
গোপাল দেব চৌধুরীও তেমনই একজন।
শ্রীমঙ্গলের সংবাদজগতের সেই ‘সংবাদ পুরুষ’ হয়তো আজ আমাদের চোখের সামনে নেই, কিন্তু তাঁর কলমের আদর্শ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার শিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়—
প্রবীণ সাংবাদিক গোপাল দেব চৌধুরী।