চা-কন্যা: শ্রীমঙ্গলের চা-ঐতিহ্যের প্রতীক ও আহমদুল কবিরের উত্তরাধিকার

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ধরে শ্রীমঙ্গলের দিকে এগোলে দূর থেকেই চোখে পড়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য—সবুজ পাহাড়ের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ভাস্কর্য। মাথায় ঝুড়ি, হাতে চা-পাতা তোলার ভঙ্গি। যেন আগত ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানাচ্ছে বাংলাদেশের চা-রাজ্যে।

এটাই বিখ্যাত চা-কন্যা ভাস্কর্য, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার মৌচাই এলাকার সাতগাঁও চা-বাগানের পাশে অবস্থিত। আজ এটি দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণ।

শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, পাহাড়, বন আর জলাভূমির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ভূদৃশ্য—যাকে অনেকেই বলেন “চায়ের স্বর্গভূমি”।

ঐতিহ্যের পথে শ্রীমঙ্গল

ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগ থেকেই শ্রীমঙ্গল চা উৎপাদন ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় চা শিল্পের বিস্তার আরও দ্রুত হয়। আজও এই উপজেলা দেশের অন্যতম শীর্ষ চা উৎপাদনকারী অঞ্চল।

মৌচাই এলাকা শ্রীমঙ্গলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। চারদিকে সবুজ চা-বাগান আর ঢেউখেলানো পাহাড়—তার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে চা-কন্যা, যা এখন শ্রীমঙ্গলের দৃশ্যমান পরিচয়।

ভাস্কর্যের নির্মাণযাত্রা

২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সাতগাঁও চা-বাগানের অর্থায়নে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী সঞ্জিত রায় এটি নকশা ও নির্মাণ করেন। প্রায় তিন মাসের কাজ শেষে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাস্কর্যটি সম্পন্ন হয়।

২৪ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে এক নারী চা-শ্রমিকের শ্রমময় জীবন। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোফিজুল ইসলাম চা-শ্রমিকদের অবদানকে সম্মান জানাতে এই উদ্যোগ নেন।

আজ চা-কন্যা শ্রীমঙ্গলের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোর একটি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে এটি দেখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর উপস্থিতি তরুণ ভ্রমণকারীদের কাছে এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

সাতগাঁও চা-বাগান ও আহমদুল কবিরের উত্তরাধিকার

ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত সাতগাঁও চা-বাগান শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। অসীম সবুজ চা-বুশ, পাহাড়ি দৃশ্য আর শান্ত পরিবেশ বহু দশক ধরে ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে আসছে।

এই বাগানটির মালিক ছিলেন আহমদুল কবির—বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সম্পাদক ও উদ্যোক্তা। ১৯২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলার পলাশ উপজেলার ঘোরশাল জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া আহমদুল কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৪৫–৪৬ মেয়াদে ডাকসুর প্রথম নির্বাচিত ভিপি হন।

অর্থনীতিতে ডিগ্রি শেষে তিনি যোগ দেন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায়। পরে পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।

তিনি ইস্টার্ন মারকেন্টাইল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। এছাড়া এসেনশিয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ, ভিটা কোলা, বেঙ্গল বেভারেজসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও তাঁর অবদান অনন্য—তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ব্যাপক সম্মান অর্জন করেন।

রাজনীতিতে সক্রিয় আহমদুল কবির ১৯৬৫ সালে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে নরসিংদী-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

চা-কন্যা: শ্রম, ইতিহাস ও পরিচয়ের প্রতীক

চা-কন্যা শুধু একটি ভাস্কর্য নয়—এটি চা-শ্রমিকদের শ্রম, চা শিল্পের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের পর্যটন ঐতিহ্যের প্রতীক। সাতগাঁও চা-বাগান ও আহমদুল কবিরের উত্তরাধিকার মিলিয়ে এটি শ্রীমঙ্গলের বৃহত্তর গল্প বলে—এক অঞ্চল যার পরিচয় গড়ে উঠেছে চা, উদ্যোগ, সংস্কৃতি এবং মানুষের অবদানে।

মহাসড়কের পাশে অসীম সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে চা-কন্যা যেন প্রতিটি পথচারীকে একটি সহজ বার্তা দেয়—

“স্বাগতম, চায়ের দেশে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *