মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে, সবুজ টিলা, চা-বাগান, বনভূমি, হাওর-বিল আর নানা জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে শ্রীমঙ্গল। বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে যার পরিচিতি ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে। কিন্তু শ্রীমঙ্গলকে কেবল চায়ের শহর হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘ ইতিহাস, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং মানুষের অবদান—অনেকটাই অদেখা থেকে যায়।
শ্রীমঙ্গল আসলে একটি জীবন্ত ইতিহাসের জনপদ। এখানে একই সঙ্গে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ, ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার, মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি ও গণকবর, চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম এবং প্রকৃতির অনন্য বৈচিত্র্য।
নামের ইতিহাসেও রয়েছে গল্প
শ্রীমঙ্গল নামটির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে লোককথা। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শ্রী দাস ও মঙ্গল দাস নামে দুই ভাই হাইল হাওরের তীরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের নাম থেকেই পরবর্তী সময়ে এলাকার নাম হয় শ্রীমঙ্গল।
তবে শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস শুধু লোককথায় সীমাবদ্ধ নয়। এ অঞ্চলে পাওয়া প্রত্ননিদর্শন প্রমাণ করে, বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই ভূখণ্ডে মানুষের বসতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল।
কালাপুর এলাকায় পাওয়া একাদশ শতকের রাজা মরুণ্ডনাথের তাম্রফলক শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। লামুয়া এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া গেছে অনন্ত নারায়ণের প্রাচীন মূর্তি।
১৪৫৪ সালে নির্মিত নিমাই শিববাড়িও এই জনপদের দীর্ঘ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো শ্রীমঙ্গলের অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করে রেখেছে।
ঔপনিবেশিক সময় থেকে আধুনিক জনপদ
ব্রিটিশ আমলে শ্রীমঙ্গলে চা-বাগানের বিস্তার ঘটে। ধীরে ধীরে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে চা উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। চা-বাগানকে ঘিরে গড়ে ওঠে নতুন জনপদ, বাজার, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো।
শ্রীমঙ্গল থানার প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১২ সালে। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় শহরটি ১৯৩৫ সালে পৌরসভায় রূপ নেয়।
চা-বাগানের বিস্তারের পাশাপাশি এ অঞ্চলে রাবার, আনারস, কাঠ, পান ও লেবুর উৎপাদনও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজকের শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে এসব পণ্য ও শিল্পের সম্পর্ক গভীর।
কৃষকের রক্তে লেখা বালিশিরা আন্দোলন
শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে বালিশিরা কৃষক আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৬৩ সালে পুলিশের গুলিতে দুই কৃষকের মৃত্যুর পর বালিশিরা এলাকায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তা কৃষক আন্দোলনে রূপ নেয়।
এই আন্দোলনে ন্যাপের বিভিন্ন নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নবাব আলী সাবদার খান রাজা সাহেব, পীর হাবিবুর রহমান, মফিজ আলী, সৈয়দ আক্কল হোসেন, আবদুল মালেক, রাসেন্দ্র দত্ত, মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়াসহ অনেকে কৃষকদের সংগঠিত করেন।
বালিশিরার সেই আন্দোলন শুধু একটি স্থানীয় কৃষক আন্দোলন ছিল না; এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কৃষকের অধিকার ও শোষণের বিরুদ্ধে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
‘জয় বাংলা মামলা’ ও গণআন্দোলন
১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানি পুলিশ রাসেন্দ্র দত্ত, মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, এম এ রহিম ও এস এ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে।
তাঁদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগ আনা হয়। সামরিক আইনবিধির ৬০ এমএলআর-এর ৮ ধারায় দায়ের করা এই মামলা স্থানীয়ভাবে ‘জয় বাংলা মামলা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
চার নেতার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রীমঙ্গলজুড়ে শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে।
এই আন্দোলনের প্রভাব ছিল ব্যাপক। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও রাজনৈতিক নেতারা শ্রীমঙ্গলে আসেন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি ও ন্যাপ নেত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আহমদুল কবির শ্রীমঙ্গলের একটি পূর্বনির্ধারিত জনসভায় অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার নেতাদের মুক্তির দাবি জানান।
অবশেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার গ্রেপ্তার চার নেতাকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের আগের উত্তাল রাজনৈতিক সময়ের শ্রীমঙ্গলের গণজাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
১৯৭১: আগুন, রক্ত ও গণহত্যার স্মৃতি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়গুলোর একটি।
৩০ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে। শুরু হয় নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। নারীদের ওপরও চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন।
শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আজও মাটির সঙ্গে মিশে আছে।
ডেপুটি ডিরেক্টর অব লেবার অফিস প্রাঙ্গণ এবং ওয়াপদা বিদ্যুৎ বিভাগের অফিস এলাকা ছিল গণহত্যার স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ভাড়াউড়া, পূর্বাশা আবাসিক এলাকা এবং তৎকালীন বিডিআর—বর্তমান বিজিবি—সদর দপ্তরের কাছের সাধুবাবার বটগাছ এলাকায় রয়েছে গণকবর ও স্মৃতিচিহ্ন।
এসব স্থান কেবল স্মৃতিসৌধ নয়; এগুলো শ্রীমঙ্গলের মানুষের জন্য ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য।
ভাষা আন্দোলনেও শ্রীমঙ্গলের ভূমিকা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঢেউ শ্রীমঙ্গলেও আছড়ে পড়েছিল।
রাসেন্দ্র দত্ত, বিরাজ কুসুম চৌধুরী, যোগেন্দ্র দত্ত, শ্যামল সেনগুপ্ত, হিতেন্দ্র গুপ্ত, অচ্যুত কুমার দেব, অখিল চন্দ্র ধর, ডা. ফজলুল হক, মো. মোসাদ্দার আলী, সৈয়দ মতিউর রহমান, ডা. আবদুল আলীসহ ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতারা ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শ্রেণির মানুষও যুক্ত হন। মুসলিম লীগের মো. ইসরাইল মিয়া, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সূর্য মণি দেব, ব্যবসায়ী অজিত চৌধুরী, ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী, বিমলজ্যোতি দেব চৌধুরীসহ অনেকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
ভাষার জন্য ঢাকার রাজপথে যে সংগ্রাম হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছেছিল শ্রীমঙ্গলের প্রত্যন্ত জনপদেও।
চায়ের রাজধানীর পরিচয়
শ্রীমঙ্গলের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারি সারি চা-গাছ, সবুজ পাহাড়ি ঢাল আর চা-শ্রমিকদের ব্যস্ত জীবন।
বাংলাদেশের চা শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। এই অঞ্চলের অসংখ্য চা-বাগান শুধু অর্থনীতির অংশ নয়, বরং শ্রীমঙ্গলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ।
চা-শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে এই ‘চায়ের রাজধানী’র খ্যাতি।
শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের চা শিল্পের উন্নয়ন, চায়ের গুণগত মান নির্ধারণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
চা নিয়ে গবেষণা, নতুন জাত উদ্ভাবন এবং উৎপাদনপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
সাত রঙা চায়ের গল্প
শ্রীমঙ্গলের আরেকটি জনপ্রিয় পরিচয় ‘সাত রঙা চা’।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা শ্রীমঙ্গলে এসে সাত রঙা চায়ের স্বাদ নিতে চান। এই চা এখন শ্রীমঙ্গলের পর্যটন পরিচয়ের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
চায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি, পর্যটন ব্যবসা ও মানুষের জীবিকা।
হাইল হাওর, বাইক্কা বিল ও পাখির রাজ্য
শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য শুধু চা-বাগানে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার হাওর, বিল, জলাভূমি ও বনভূমি এক অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।
বাইক্কা বিল পাখিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। এখানে নানা প্রজাতির পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির দেখা মেলে। বড় ঠোঁটের রিড ওয়ার্বলারসহ বিভিন্ন বিরল পাখির উপস্থিতি এ এলাকার পরিবেশগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
মাধবপুর লেকও শ্রীমঙ্গলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়ের সবুজ, স্বচ্ছ জল আর নীরব প্রকৃতি মিলে জায়গাটিকে করেছে অনন্য।
এ অঞ্চলে গ্রেট হোয়াইট-বেলিড হেরনের উপস্থিতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এই বিরল পাখিটির নিশ্চিত উপস্থিতির স্থান হিসেবে মাধবপুর লেকের নাম উঠে আসে।
রাবার, আনারস আর মাটির গন্ধ
চায়ের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের আনারসও সুপরিচিত।
এ অঞ্চলের আনারসের স্বাভাবিক মিষ্টতা ও স্বাদের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদা রয়েছে।
চা, আনারস, রাবার, লেবু, পান ও কাঠ—সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের কৃষি ও বাণিজ্যিক অর্থনীতি একটি বহুমাত্রিক কাঠামো তৈরি করেছে।
হামহাম: বনের গভীরে নতুন আকর্ষণ
২০১০ সালে শ্রীমঙ্গলের রাজকান্দি বনাঞ্চলে হামহাম জলপ্রপাত পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ঘন সবুজ বন পেরিয়ে দুর্গম পথ ধরে জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আলাদা রোমাঞ্চ তৈরি করে।
হামহাম প্রমাণ করেছে, শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা শুধু চা-বাগান বা মাধবপুর লেকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
শিক্ষার আলোয় শ্রীমঙ্গল
শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালে। শতবর্ষ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখনো এই জনপদের শিক্ষা ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে ভুনবীর দশরথ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ সালে। এত পুরোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি প্রমাণ করে, শ্রীমঙ্গলে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার বহু আগেই শুরু হয়েছিল।
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করেনি; তারা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সমাজকর্মী তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জনপদ
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও শ্রীমঙ্গলের মানুষের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ফণী দত্ত পানিনী, গিরিজা চৌধুরী, যতীন্দ্র মোহন দত্ত, সারদা দাস তারাফদার, প্রমথ দেব, নগেন ঘোষ, সুরেশ সোম, যোগেশ চ্যাটার্জি, যতীন পাল চৌধুরী, বরদাকান্ত সেন, মহেন্দ্র শর্মা, সূর্যমণি দেব, বিপিন দাস, যতীন দেব, মাস্টার গৌর গোবিন্দ দেব, দ্বিজেন ভট্টাচার্য, মনমোহন ভট্টাচার্য, লাকু দত্ত চৌধুরী, লীলা দত্ত চৌধুরী, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, হৃদয় দেব, অমর দত্তসহ বহু মানুষ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁদের সংগ্রামের গল্প শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও নাগরিক সমাজ
শ্রীমঙ্গল থেকে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছেন বহু রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।
জীবন সাঁওতাল, ডা. সূর্যমণি দেব, যতীন্দ্র মোহন দত্ত, অজিত চৌধুরী, লাকু দত্ত চৌধুরী, দেওয়ান আবদুর রশিদ, মো. ইলিয়াস, মোহাম্মদ আহাদ মিয়া, শফিকুর রহমান, ক্ষীরোদ দেব চৌধুরী, এম এ মুসাব্বির, ডা. গিরীন্দ্র চক্রবর্তী, এস কে রায়, ডা. রামারঞ্জন দেব, রাসেন্দ্র দত্ত, ডা. আবদুল আলী, ডা. গোলাম জিলানি, বিপুল রঞ্জন চৌধুরী, মো. শাহজাহান মিয়া, ইসমাইল হোসেন, আশকির মিয়া, এম এ রহিম, কমলেশ ভট্টাচার্য, আবদুস শহীদ, মহসিন মিয়া মধুসহ অনেকে শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অবদান রেখেছেন।
চা-শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনেও বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুরেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জি ও রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জির মতো নেতারা।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি রক্ষার ক্ষেত্রেও শ্রীমঙ্গলের মানুষের অবদান রয়েছে। শিতেশ দেবের মতো মানুষ প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
সাংবাদিকতারও দীর্ঘ ঐতিহ্য
শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার ইতিহাসও বেশ পুরোনো।
রাসেন্দ্র দত্ত, বিপুল রঞ্জন চৌধুরী, জহির উদ্দিন আহমেদ, কমলেশ ভট্টাচার্য, মো. আলফু মিয়া চৌধুরী, মো. আবদুল গফফার, বিধু ভূষণ পাল স্বপন, মো. আবদুল হাই, এম এ সালাম চৌধুরী, এম এ জলিল, মো. মাহরাম খান, গোপাল দেব চৌধুরী, সৈয়দ নেছার আহমেদ, রানা দেব রায়, ইসহাক কাজল, অধ্যক্ষ মো. মাহিউদ্দিন, এম এ আলী, ইবনে জামান শামসু, সংগ্রাম দত্ত, নীহারেন্দ্র হোম চৌধুরীসহ অনেক সাংবাদিক বিভিন্ন সময়ে শ্রীমঙ্গলের সংবাদ ও জনজীবন তুলে ধরেছেন।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন তরুণ সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী বুলেট, ইসমাইল মাহমুদ, এএফএম আবদুল হাই ডন, সৈয়দ আমিরুজ্জামান, মো. আবদুল সুবহান, স্বপন কুমার সিংহ, পার্থসারথি দেব ধ্রুব, বিকুল চক্রবর্তী, মো. ইদ্রিস আলী ও কাওসার ইকবালসহ অনেকে উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৬ সালে শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডে মূল্যবান একটি খাস/অর্পিত সম্পত্তির জমি তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসনের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের নামে ইজারা দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই জায়গাটি প্রেস ক্লাবের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যায়।
সংস্কৃতির মাটিতেও সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গল
শ্রীমঙ্গলের পরিচয় শুধু রাজনীতি, চা বা প্রকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এ অঞ্চলের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য।
গীতিকার এ কে আনাম, রাসবিহারী চক্রবর্তী, শিতেশ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী, রঙ্গলাল দেব চৌধুরী, বুলবুল আনাম, জিল্লুর আনাম, বাউল আবুল কাসেম, কানাইলাল তাঁতি, জৈতুন নাহার শাহাদাত, অবিনাশ দেব রায়, শ্যামসুন্দর রবিদাস, সুমিত্রা ঘোষসহ বহু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
রূপা, সুজাতা ঘোষ মুন্না, রিতা চক্রবর্তী, উত্তম কুমার ভৌমিকসহ আরও অনেকে সংস্কৃতিচর্চায় অবদান রেখেছেন।
নয় ইউনিয়নের শ্রীমঙ্গল
বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলা একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো—আশিদ্রোন, ভুনবীর, কালাপুর, কালিঘাট, মির্জাপুর, রাজঘাট, সাতগাঁও, সিন্দুরখান ও শ্রীমঙ্গল।
এসব ইউনিয়নের অধীনে রয়েছে অসংখ্য মৌজা ও গ্রাম। আর শ্রীমঙ্গল পৌরসভা বিভক্ত নয়টি ওয়ার্ড ও ২০টি মহল্লায়।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, মানুষ, সংস্কৃতি ও স্মৃতি। ফলে শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস আসলে একক কোনো শহরের ইতিহাস নয়—এটি পুরো জনপদের মানুষের সম্মিলিত ইতিহাস।
শ্রীমঙ্গল—শুধু চায়ের শহর নয়
শ্রীমঙ্গলের পরিচয়কে যদি শুধু ‘চায়ের রাজধানী’ শব্দের মধ্যে আটকে রাখা হয়, তাহলে এই জনপদের ইতিহাসের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।
এখানে আছে একাদশ শতকের প্রত্ননিদর্শন, প্রাচীন মন্দির, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি, কৃষকের রক্তে লেখা বালিশিরা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ১৯৭০-এর গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ও গণকবর, শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতার ঐতিহ্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রাম।
আবার অন্যদিকে আছে চা-বাগানের সবুজ, মাধবপুর লেকের নীল জল, হাইল হাওর ও বাইক্কা বিলের পাখি, রাজকান্দির বন, হামহামের জলধারা, আনারসের মিষ্টি স্বাদ আর সাত রঙা চায়ের বৈচিত্র্য।
সবকিছু মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল যেন একই সঙ্গে ইতিহাসের বই, প্রকৃতির ক্যানভাস এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
ভবিষ্যতের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজন
শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস যত সমৃদ্ধ, তা সংরক্ষণের প্রয়োজনও তত বেশি।
প্রাচীন স্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধের গণকবর, বধ্যভূমি, পুরোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চা-বাগানের ইতিহাস, চা-শ্রমিকদের জীবন, নদী-হাওর-বিল, বন ও স্থানীয় সংস্কৃতির উপাদানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।
প্রয়োজন পুরোনো দলিল ও ছবি ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ, স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, তরুণদের ইতিহাসচর্চায় যুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে একটি স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
কারণ একটি জনপদের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার বর্তমান দিয়ে তৈরি হয় না। অতীতকে জানার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করা যায়।
শ্রীমঙ্গল তাই শুধু চায়ের রাজধানী নয়।
এটি কৃষকের আন্দোলনের স্মৃতি, ভাষার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়, শিক্ষার আলো, সাংবাদিকতার ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বহুত্ব এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য জনপদ।
চা-বাগানের সবুজ পাতার আড়ালে যে দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে, সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এখন সময়ের দাবি।
শ্রীমঙ্গল—শুধু চায়ের শহর নয়; ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষের এক জীবন্ত জনপদ।