শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৬নং আশিদ্রোন ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উদনারপাড় গ্রাম। প্রকৃতির রূপালী ছায়ায় ঘেরা এই জনপদের বুকে আলো জ্বেলে যাওয়া কিছু মানুষের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। তেমনই এক প্রবাদপ্রতিম ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম আব্দুল হাফিজ। তিনি ছিলেন এই গ্রামেরই কৃতি সন্তান, মৃত আব্দুর রহমান মেম্বারের সুযোগ্য উত্তরসূরী। প্রবাসে থেকেও যিনি সবসময় হৃদয়ে ধারণ করতেন নিজের জন্মভূমিকে।

গ্রামের উন্নয়নে যার ছিল আজীবন ব্রত
মরহুম আব্দুল হাফিজ শুধু একজন সাধারণ প্রবাসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন উদনারপাড় গ্রামের যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের অভিভাবক। শত শত তরুণ ও যুবকের মাথার ওপর তাঁর স্নেহের ছায়া সবসময় বজায় ছিল। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ও স্বপ্ন ছিল উদনারপাড় গ্রামের বহুমুখী উন্নয়ন। গ্রামের অনুন্নত রাস্তাঘাট সংস্কার, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য খাতের মান উন্নয়ন—এই ত্রিমুখী লক্ষ্য নিয়েই তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছে, নিজের সব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তিনি তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
রাস্তাঘাট সংস্কার ও পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম
একটি গ্রামের উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। কিন্তু ২০০৫-২০২০ সালের সেই সময়টায় উদনারপাড় গ্রামের রাস্তাঘাটের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেসময় গ্রামের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছিল মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তবান ব্যক্তির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও খেয়ালখুশির অধীন। সাধারণ মানুষের কথা বলার বা পরিবর্তনের দাবি তোলার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।
ঠিক সেই সময়ে একরকম দুর্গম পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্ষমতার বলয় ভাঙতে এগিয়ে আসেন মরহুম আব্দুলহাফিজ। বিত্তবানদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। তাঁর সাহসিকতা ও দূরদর্শিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উদনারপাড় গ্রামের তরুণ ও যুবসমাজ তাঁর সাথে একরকম অদম্য সংগ্রাম ঘোষণা করে। সাধারণ মানুষের নায্য অধিকার আদায় এবং রাস্তাঘাট উন্মুক্ত করার এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন আব্দুল হাফিজ সাহেব।
উদনারপাড় যুব সংঘ”-এর ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ
এই ন্যায়সংগত ও পরিবর্তনের লড়াইয়ে মরহুম আব্দুল হাফিজের হাত ধরেই নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় “উদনারপাড় যুব সংঘ”। যুবসমাজের এই সংগঠনটি তাঁর পাশে এসে শক্ত ঢাল হিসেবে দাঁড়ায়। প্রবাসীর দূরদৃষ্টি আর স্থানীয় যুবকদের অদম্য সাহসিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে বদলে যেতে শুরু করে গ্রামের চিরচেনা দৃশ্যপট। বিত্তবানদের বাধা বিপত্তিকে পেছনে ফেলে তরুণরা রাস্তায় নেমে আসে, শুরু হয় রাস্তাঘাট সংস্কার ও অধিকার আদায়ের এক নতুন অধ্যায়।
সমাপ্তি
মরহুম আব্দুল হাফিজ সশরীরে আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, সততা এবং উন্নয়নের স্বপ্ন আজও উদনারপাড় গ্রামের মানুষের হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত। ২০০৫-২০২০ সালের কালপরিক্রমায় তাঁর নেতৃত্বে যে সংগ্রামের বীজ রোপিত হয়েছিল, তারই ফলে আজ উদনারপাড় গ্রামের যুবসমাজ যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখেছে। মরহুম আব্দুল হাফিজ তাঁর কাজের মাধ্যমে উদনারপাড় গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে চিরদিন একটি আলোকিত নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।