অপরূপ প্রকৃতির মাঝে আধ্যাত্মিক শান্তির ঠিকানা শ্রীমঙ্গলের জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সবুজ বনানী, পাহাড় আর চা বাগানের মায়াবী রূপ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে সবসময়ই এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। তবে প্রকৃতির এই সুজলা-সুফলা রূপের মাঝে সম্প্রতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত দৃষ্টিনন্দন জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ (মূল নাম: মসজিদুল আউলিয়া খাজা শাহ্ মোজাম্মেল হক রহ.)। শান্ত পরিবেশ, চমৎকার স্থাপত্যশৈলী আর আধ্যাত্মিক আবহ দেখতে এখানে প্রতিদিন ভিড় জমান ভ্রমণপিপাসুরা।
পাহাড়ের অনন্য অবস্থান
শ্রীমঙ্গল শহরের গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টের বিপরীত পাশের রাস্তা ধরে এগোলেই চোখে পড়বে এই নান্দনিক স্থাপনাটি। প্রায় ১৯ বিঘা জমির ওপর সমতল থেকে প্রায় ৭০-৮০ ফুট উঁচুতে পাহাড়ের ঢালে এর অবস্থান। চারপাশ ঘিরে রয়েছে সারি সারি চা বাগান, লেবু ও আনারস বাগান। চারপাশের সবুজ সমারোহ, নাম না-জানা পাখির কলকাকলি আর ঝিঁঝি পোকার ডাক এই প্রাঙ্গণে তৈরি করেছে এক অন্যরকম নিরিবিলি পরিবেশ।
মসজিদে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাও বেশ রোমাঞ্চকর। মূল ফটক পেরিয়ে নাম এন্ট্রি করার পর দর্শনার্থীদের পাড়ি দিতে হয় প্রায় ১৫০টি সিঁড়ি। সিঁড়িগুলোর লাল ও সাদা রঙের মিশ্রণ সবুজের বুকে এক নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা করে।
দর্শনীয় স্থাপত্য ও নকশা
তুর্কি স্থাপত্যের আদলে নির্মিত এই মসজিদটি প্রথাগত বিশালাকার কোনো স্মারক নয়; বরং এটি একটি শান্ত সাদা রঙের আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল। এর নকশা করেছেন বিশিষ্ট স্থপতি খন্দকার আবদাল হোসেন (Reincarnation)। মসজিদের বহির্দেশ ও ফাসাদে ত্রিকোণাকৃতির জ্যামিতিক কাঠের জালি বা স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভেতর দিয়ে আলো ও ছায়ার চমৎকার খেলা তৈরি হয়। এছাড়া এর ভেতরের অংশে কোনো অতিরিক্ত স্তম্ভ বা কলামের বাধা ছাড়াই প্রায় ৮০০ মুসল্লি একসঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ভেতরের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সুদূর চীন থেকে নিয়ে আসা একটি দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি।
ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক সংযোগ
দর্শনীয় এই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন খাজা টিপু সুলতান। তিনি প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক খাজা শাহ মোজাম্মেল হক (রহ.)-এর পুত্র। আর খাজা শাহ মোজাম্মেল হক (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি-সাধক খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রহ.)-এর উত্তরসূরি। প্রতি বছর ২৪ নভেম্বর এই মসজিদ প্রাঙ্গণে বার্ষিক ওরস মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
মানবসেবা ও সামাজিক কার্যক্রম
কেবল ইবাদত-বন্দেগি নয়, মসজিদটিকে একটি মানবিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা হয়েছে। ‘খাজা শাহ্ মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক পরিচালিত এই প্রাঙ্গণে রয়েছে গেস্টহাউস, কবরস্থান এবং একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। এই চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে সপ্তাহের ছয় দিন এলাকার দরিদ্র ও সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়।
যাতায়াত ব্যবস্থা
শ্রীমঙ্গল শহর কিংবা গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টের সামনে থেকে সিএনজি, ইজিবাইক বা অটোরিকশা রিজার্ভ করে সহজেই এই মসজিদে যাওয়া যায়। শহর থেকে যাতায়াতের ভাড়া সাধারণত তিন থেকে চারশ টাকার মতো হয়ে থাকে। চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া যায় এই শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার ঠিকানায়।