১৯৬৩ সালের কৃষক আন্দোলন থেকে ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ—দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের স্মৃতি বয়ে চলেছেন শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ এই সংগঠক
আমার শ্রীমঙ্গল ফিচার : ১৯৬৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পাহাড় তখন শুধু পাহাড় ছিল না—ছিল ভূমি, জীবিকা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে উত্তাল এক জনপদ। কৃষক, শ্রমজীবী ও স্থানীয় অধিবাসীদের সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ৮০ বছরের কৃষক গণু মিয়া ও ১৯ বছরের তরুণ সালিক মিয়া। তাঁদের রক্তে লেখা হয়ে যায় বালিশিরার ইতিহাস। ঐতিহাসিক সেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও তিনি বয়ে চলেছেন সেই দিনের স্মৃতি, সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও অপূর্ণ দাবির ইতিহাস।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একাধিক স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদনে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীকে ১৯৬৩ সালের বালিশিরা পাহাড় আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে তাঁর জন্ম ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৩ সালের বালিশিরা পাহাড় আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

যে পাহাড়কে ঘিরে জেগে উঠেছিল কৃষকসমাজ
পাকিস্তান আমলে বালিশিরা পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার জমি নিয়ে নতুন চা-বাগান স্থাপনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষক, শ্রমজীবী ও পাহাড়নির্ভর মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের জমি থেকে বাঁশ, বেত, শন ও কাঠ সংগ্রহ করে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতেন। জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাঁদের দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অধিকার ছিল জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিষয়।
অন্যদিকে চা-বাগান সম্প্রসারণের জন্য জমি বন্দোবস্তের উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সেই বিরোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় সংগঠিত কৃষক আন্দোলনে।
রাসেন্দ্র দত্ত তখন তরুণ। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা তাঁকে দ্রুত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে বালিশিরা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠকদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯ ফেব্রুয়ারি: যে দিন ইতিহাস রক্তাক্ত হয়েছিল
১৯৬৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বালিশিরা অঞ্চলে কৃষকদের বড় সমাবেশ ও আন্দোলন সংঘটিত হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন কৃষক গণু মিয়া ও তরুণ সালিক মিয়া।
এই দুটি মৃত্যু বালিশিরার কৃষক আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতারা সংগঠিত হন, সভা-সমাবেশ করেন এবং কৃষকদের দাবিকে বৃহত্তর জনপরিসরে নিয়ে আসেন।
রাসেন্দ্র দত্তের ভূমিকা ছিল সেই সংগঠনেরই একটি অংশ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কৃষক নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, চাঁন মিয়া মহালদারসহ আরও অনেকে। স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদনে ১৯৬৩ সালের আন্দোলনের নেতৃত্বে রাসেন্দ্র দত্ত ও শাহজাহান মিয়ার নাম একসঙ্গে উঠে এসেছে।
শহীদ গণু-সালিকের স্মৃতি ধরে রাখার লড়াই
বালিশিরার আন্দোলন শুধু জমির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গণু মিয়া ও সালিক মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণও হয়ে ওঠে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে শ্রীমঙ্গলে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে বালিশিরার শহীদদের স্মৃতি যুক্ত করা হয় বলে বিভিন্ন স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ আছে। শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের পাশাপাশি বালিশিরার শহীদ গণু ও সালিকের স্মরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
এভাবেই ১৯ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় ইতিহাসে একটি আলাদা স্মরণদিবসের তাৎপর্য পায়।
শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা
বালিশিরা আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া। আন্দোলনের পর বহু বছর ধরে তাঁর সঙ্গে রাসেন্দ্র দত্ত শহীদ দিবস পালন ও স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
শাহজাহান মিয়া ১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মারা যান। চাঁন মিয়াও ২০১৫ সালে মারা যান। ফলে বালিশিরা আন্দোলনের প্রথম সারির বহু সংগঠক আজ ইতিহাসের অংশ। তাঁদের প্রজন্মের মধ্যে রাসেন্দ্র দত্তের দীর্ঘ জীবন ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এখন বিশেষ মূল্যবান একটি মৌখিক ইতিহাসের উৎস হয়ে উঠেছে।
আন্দোলন থামেনি ১৯৬৩-তেই
বালিশিরা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জমি নিয়ে বিরোধ নয়; পাহাড়, বন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার সম্পর্কও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
স্বাধীনতার পরও বালিশিরা ইউএসএফ এলাকার জমি ও বনসম্পদ নিয়ে দখল, ব্যবহার ও সংরক্ষণ প্রশ্নে নানা আন্দোলনের কথা স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়। এসব আন্দোলনের মধ্যে রাসেন্দ্র দত্ত, শাহজাহান মিয়া ও চাঁন মিয়ার নেতৃত্বে প্রতিবাদ, মিছিল, সভা ও দাবিনামা পেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৮০ ও ১৯৮১ সালের সরকারি নির্দেশনার প্রসঙ্গও স্থানীয় একটি ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে বালিশিরা ইউএসএফ এলাকাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে প্রশাসনিক নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় ইতিহাসে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অসন্তোষের কথাও উঠে এসেছে।
১৯৮৭: রাষ্ট্রপতির সামনে বালিশিরার দাবি
রাসেন্দ্র দত্তের সংগ্রামী জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ১৯৮৭ সাল। স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপস্থিতিতে মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে তিনি জনস্বার্থে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে বালিশিরা ইউএসএফকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার বিষয়ে আগের সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের দাবিও ছিল।
সেই সময় তিনি শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বলেও একই সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর এই অবস্থান দেখায়—বালিশিরার প্রশ্ন তাঁর কাছে কেবল অতীতের আন্দোলনের স্মৃতি ছিল না; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা স্থানীয় ভূমি, বন ও জীবিকার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বালিশিরা থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে
রাসেন্দ্র দত্তের সংগ্রামের পরিধি বালিশিরায় থেমে থাকেনি। স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক সূত্রে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, বালিশিরা কৃষক আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে সম্পৃক্ততার উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল তাঁকে গ্রেপ্তারের কথাও একটি জীবনীভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, তাঁকে অন্য কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে গ্রেপ্তার করে মৌলভীবাজার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ আছে। পাকিস্তানি বাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন—এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
সাংবাদিকতার কলমেও মানুষের কথা
রাসেন্দ্র দত্ত শুধু রাজনৈতিক সংগঠক নন; দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁকে চার দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে জনমত গঠনে তাঁর ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
এখানেই তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—মিছিলের পাশাপাশি কলমও ছিল তাঁর সংগ্রামের মাধ্যম।
একদিকে মাঠের আন্দোলন, অন্যদিকে সংবাদপত্রে মানুষের কথা তুলে ধরা—দুই পথেই তিনি স্থানীয় ইতিহাসের নানা অধ্যায়কে জনপরিসরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
আজ তিনি ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী
১৯৬৩ সালের বালিশিরা আন্দোলনের সময় যে তরুণ রাসেন্দ্র দত্ত কৃষকদের সঙ্গে মাঠে নেমেছিলেন, সময়ের দীর্ঘ স্রোত পেরিয়ে আজ তিনি প্রবীণ। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৮৬ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে তাঁকে বালিশিরা পাহাড় আন্দোলনের অন্যতম জীবিত সংগঠক এবং বালিশিরা পাহাড় পুনরুদ্ধার কমিটির সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বয়সে তাঁর কাছে বালিশিরার ইতিহাস কোনো বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা নয়। সেটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্মৃতি—মিছিলের শব্দ, উত্তেজনাপূর্ণ জনপদ, পুলিশের উপস্থিতি, গুলির শব্দ, মানুষের আতঙ্ক, দুই মানুষের মৃত্যু এবং পরবর্তী আন্দোলনের দীর্ঘ পথ।
তাঁর প্রজন্মের অনেকেই চলে গেছেন। মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া নেই, চাঁন মিয়া নেই। গণু মিয়া ও সালিক মিয়া তো সেই ১৯৬৩ সালেই ইতিহাসের পাতায় শহীদ হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন।
তাই রাসেন্দ্র দত্তের কাছে ফিরে যাওয়া মানে শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিক বা সাংবাদিকের জীবনী লেখা নয়—ফিরে যাওয়া শ্রীমঙ্গলের একটি বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়ের কাছে।
ইতিহাসের কাছে নতুন প্রজন্মের দায়
বালিশিরা আন্দোলনের ইতিহাসের অনেক তথ্য স্থানীয় স্মৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও সংবাদপত্রের বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণে পুরোনো দলিল, সরকারি নথি, সংবাদপত্রের আর্কাইভ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার একত্র করা জরুরি।
রাসেন্দ্র দত্তের মতো জীবিত প্রত্যক্ষ সংগঠকদের স্মৃতিও সেই কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ মানুষের স্মৃতি একসময় হারিয়ে যায়; মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি সময়ের অমূল্য অভিজ্ঞতাও।
বালিশিরা পাহাড়ের সেই আন্দোলন আজ ছয় দশকের বেশি পুরোনো। কিন্তু গণু মিয়া ও সালিক মিয়ার নাম এখনও উচ্চারিত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি এখনও স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণ করা হয়। আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একজন প্রবীণ সংগঠক আজও জীবিত—রাসেন্দ্র দত্ত।
তিনি যেন একটি জীবন্ত আর্কাইভ।
একটি প্রজন্মের কাছ থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার শেষ সেতুগুলোর একজন।