বিশেষ প্রতিবেদন: আজ বিশ্ব নদী দিবস। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় নদীর গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে পালন করা হচ্ছে দিনটি। কিন্তু মৌলভীবাজারের পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্রীমঙ্গলে এসে ‘বিশ্ব নদী দিবস’-এর বার্তা যেন থমকে দাঁড়ায়। সরকারি বা ভৌগোলিক মানচিত্রে এখনো যে নদী ও জলাশয়গুলোর নাম শোভা পাচ্ছে, বাস্তবে তা দখলের উৎসব, পলি জমে ভরাট হওয়া আর চরম অবহেলায় মৃতপ্রায় নালায় পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে করুণ দশা এই অঞ্চলের প্রাণবিন্দু ‘হাইল হাওড়’ এবং এর সাথে সংযুক্ত নদী ও ছড়াগুল।
মানচিত্রের নদীগুলো আজ কোথায়?
শ্রীমঙ্গল উপজেলার মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় এক সমৃদ্ধ জলপথের জাল। গোপলা নদী, বিলাস নদী, ফুলছড়ি নদী, লুন্দু নদী কিংবা বাঘ ছড়া নদী—এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে সজীব রেখেছিল যুগ যুগ ধরে। কিন্তু আজ মানচিত্রের সেই প্রবহমান নদীগুলো বাস্তবে সংকীর্ণ খাল বা মরা নালায় রূপ নিয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা পলি, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা এবং নদী তীরের অবৈধ দখলের কারণে নদীগুলোর নাব্যতা হারিয়ে গেছে। বর্ষাকালে কিছুটা পানির প্রবাহ দেখা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে এগুলো শুকিয়ে যেন ধু-ধু প্রান্তর বা সামান্য নালায় পরিণত হয়।
সংকটে বিশাল ‘হাইল হাওড়’
শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের অন্যতম বৃহত্তম জলভূমির অংশ হাইল হাওড়। গোপলা নদীসহ একাধিক ছড়া ও নদী এই হাওড়ের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে আসছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপদখল, অপরিকল্পিত বাঁধ, নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহার এবং কৃত্রিমভাবে পানি সেচে মাছ ধরার কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে এই হাইল হাওড়। হাওড়ের বিশাল অংশ জুড়ে পলি জমে গভীরতা কমে গেছে, যার ফলে বর্ষায় অকাল বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
বিলুপ্তির পথে জীববৈচিত্র্য
নদী ও হাইল হাওড় ধ্বংসের ফলে মারাত্মক প্রভাবে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশের ওপর:
- দেশীয় মাছের সংকট: পাবদা, গুলশা, আইড়, চিতলসহ বহু প্রজাতির দেশীয় মাছ আজ বিলুপ্তির পথে।
- অতিথি পাখির সংখ্যা হ্রাস: শীতকালে যেসব পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে হাইল হাওড় মুখরিত থাকত, জলাশয়ের আয়তন ও খাবার কমে যাওয়ায় তাদের আগমন অনেকটাই কমে গেছে।
- কৃষকদের ভোগান্তি: কৃষি কাজে সেচের পানির জন্য কৃষকদের এখন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
নেই কার্যকর উদ্যোগ
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ— নদী ও জলাশয় রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর বা স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন (ড্রেজিং) এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপের চরম অভাব রয়েছে। কাগজে-কলমে কিছু পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
উদ্ধার ও সংরক্ষণে আশু করণীয়
নদী দিবসে শ্রীমঙ্গলের নদী ও হাইল হাওড়কে বাঁচাতে অবিলম্বে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. সীমানা চিহ্নিতকরণ ও দখলমুক্ত করা: গোপলা, বিলাস ও অন্যান্য নদীসমূহের সঠিক সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ দখলদারদের কঠোর হাতে উচ্ছেদ করা।
২. নদী ও হাওড় খনন: নদীগুলোর নাব্যতা ফেরাতে এবং হাইল হাওড়ের গভীরতা বাড়াতে অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক উপায়ে খননকাজ শুরু করা।
৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চা বাগান ও শহরের বর্জ্য যাতে সরাসরি নদীতে না পড়ে, তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করা।
৪. জীববৈচিত্র্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা: হাওড়ের নির্দিষ্ট অংশকে পুরোপুরি মাছ ও পাখির জন্য সংরক্ষিত অভয়াশ্রম ঘোষণা করা।
শ্রীমঙ্গলের সবুজ প্রকৃতি এবং অর্থনীতি—দুটোই বেঁচে আছে এই নদী ও হাইল হাওড়কে কেন্দ্র করে। আজ নদী দিবসে কেবল লোকদেখানো আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নদী ও হাওড় বাঁচাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, নইলে মানচিত্র ছাড়া বাস্তবত রূপ নেবে এক মরুপ্রান্তরে।