কোনো কোনো জনপদের ইতিহাস লেখা থাকে সরকারি নথির পাতায়। আবার কোনো কোনো জনপদের ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে—রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, চা-বাগানের শ্রমিক লাইনে, স্কুলের মাঠে, বাজারের মোড়ে কিংবা গ্রামের সেই পথটিতে, যেখানে একদিন হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে নেমেছিল।
শ্রীমঙ্গল তেমনই এক জনপদ।
আজ সবুজ চা-বাগান, টিলা, বন আর পর্যটনের শহর হিসেবে শ্রীমঙ্গলের পরিচিতি সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই সবুজের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে কৃষকের অধিকার, চা-শ্রমিকের জীবন-জীবিকা, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম—প্রতিটি অধ্যায়েই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিল শ্রীমঙ্গলের মানুষ।
আর ১৯৭১ সালে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক চেতনা রূপ নেয় স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে।
শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস তাই কেবল একটি উপজেলার ইতিহাস নয়। এটি বাংলার রাজনৈতিক জাগরণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের দাঁড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের বৃহত্তর ইতিহাসেরও অংশ।
প্রতিরোধের ঐতিহ্য যেভাবে গড়ে উঠল
ব্রিটিশ শাসনামলেই শ্রীমঙ্গলে রাজনৈতিক সচেতনতার ভিত তৈরি হতে শুরু করে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিদেশি পণ্য বর্জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়। শ্রীমঙ্গলেও সেই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিদেশি কাপড় বর্জনের পাশাপাশি তাঁত ও খদ্দরের পোশাক ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করেন।
ফণী দত্ত পানিনী, গিরিজা চৌধুরী, যতীন্দ্র মোহন দত্ত, সারদা দাস তারাফদার, প্রমথ দেব, নগেন ঘোষ, সুরেশ সোম, যোগেশ চ্যাটার্জি, যতীন পাল, বরদাকান্ত সেন, মহেন্দ্র শর্মা, সূর্যমণি দেব, বিপিন দাস, যতীন দেব, মাস্টার গৌর গোবিন্দ দেব, দ্বিজেন ভট্টাচার্য, মনমোহন ভট্টাচার্য, লাকু দত্ত চৌধুরী, লীলা দত্ত চৌধুরী, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, হৃদয় দেব, অমর দত্ত, যশোদা গোবিন্দ গোস্বামী, ইন্দ্র হোম চৌধুরী, মোহাম্মদ ইউনুস উদ্দিন ও নগেন্দ্র ধরসহ অনেকে সেই সময়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতার যে বীজ তখন বপন হয়েছিল, তা আর মুছে যায়নি।
রেলস্টেশনে জাতীয় নেতাদের আগমন
পরবর্তী সময়ে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের ঢেউও এসে পৌঁছায় শ্রীমঙ্গলে।
সারা ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে এই ছোট্ট জনপদের মানুষের যোগাযোগ তৈরি হতে থাকে। জাতীয় নেতাদের আগমন স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সক্রিয় করে তোলে।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শ্রীমতী বাসন্তী দেবী ও মওলানা মোহাম্মদ আলীর শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে আগমন ছিল সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁরা মৌলভীবাজারে খেলাফত সম্মেলনে যাওয়ার পথে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে আসেন। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা ফুলের মালা দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানান।
রেলস্টেশন তখন শুধু যাতায়াতের স্থান ছিল না; রাজনৈতিক যোগাযোগ ও জনমত গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
বিপ্লবী রাজনীতির ছায়া
১৯২০-এর দশকের শেষদিকে শ্রীমঙ্গলে বিপ্লবী রাজনীতির প্রভাবও বাড়তে থাকে।
লাহোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬৩ দিন অনশন করার পর যতীন দাসের মৃত্যুর খবর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালে স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়। বর্তমান বড়বাড়ি কালীমন্দির—তৎকালীন মারওয়ারি কালী বাড়িতে—তাঁর স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। যোগেশ চ্যাটার্জি ও সতীশ সোম সভাটি আয়োজন করেন।
ব্রিটিশ সরকার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহজভাবে নেয়নি।
১৯২৯ সালে যুগান্তর বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ডা. সূর্যমণি দেব ও যতীন্দ্রনাথ পাল চৌধুরী গ্রেপ্তার হন।
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীমঙ্গল থানা কংগ্রেস কমিটি। এর দুই বছর পর ১৯৩২ সালে গড়ে ওঠে অনুশীলন সমিতির শাখা।
ব্রিটিশ পুলিশের দমন-পীড়নও শুরু হয়। লাল পাগড়ি পরা পুলিশ কংগ্রেস কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। যতীন্দ্র পাল চৌধুরীসহ এক শিক্ষার্থী পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন।
একদিকে দমন-পীড়ন, অন্যদিকে আন্দোলন—এই দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক চরিত্রকে দৃঢ় করে তোলে।
নেতাজি-নেহরুর পদচারণায় শ্রীমঙ্গল
জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আগমন শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শ্রীমঙ্গলে এসে নিউবাজারে এক জনসভায় বক্তব্য দেন।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু শ্রীমঙ্গলে আসেন চারবার—১৯৩৬, ১৯৩৮, ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও সিলেটের গণভোটসহ তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।
ততদিনে শ্রীমঙ্গলের মানুষ বুঝে গেছে—দেশের বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে এই জনপদ দূরে নয়।
মুসলিম লীগের উত্থান ও ১৯৪৭-এর গণভোট
শ্রীমঙ্গলের রাজনীতিতে কংগ্রেস, বিপ্লবী সংগঠন ও অন্যান্য দলের পাশাপাশি মুসলিম লীগেরও প্রভাব বাড়তে থাকে।
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর শ্রীমঙ্গল থানা মুসলিম লীগ কমিটি গঠিত হয়। মোহাম্মদ ইসরাইল সভাপতি এবং আবদুস সোবহান চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন।
১৯৪৫ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রী স্যার সৈয়দ মুহাম্মদ সাদউল্লাহ মতিগঞ্জ বাজারে জনসভায় বক্তব্য দেন। পরের বছর শ্রীমঙ্গলে নির্বাচনী প্রচারে আসেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান।
এরপর আসে ১৯৪৭-এর গণভোট।
সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই গণভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের ফলাফলে পাকিস্তানের পক্ষে পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে পড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট।
ফলে বৃহত্তর সিলেটের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলও পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অবসান মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার শেষ ছিল না। বরং নতুন রাষ্ট্রের ভেতরেই শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
ভাষার প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক জাগরণ
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুতই ভাষার প্রশ্ন সামনে আসে।
পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হলেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ভাষার প্রশ্নটি ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক দাবি থেকে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
১১ মার্চ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হলে পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকায় আন্দোলন তীব্র হওয়ার পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলেও শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে শুরু করেন।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন দিবস পালন, মিছিল ও প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন।
রাসেন্দ্র দত্ত, বিরাজ কুসুম চৌধুরী, যোগেন্দ্র দত্ত, শ্যামল সেনগুপ্ত, হিতেন্দ্র গুপ্ত, অচ্যুত কুমার দেব, অখিল চন্দ্র ধর, ডা. ফজলুল হক, মো. মোসাদ্দার আলী ও সৈয়দ মতিউর রহমানসহ অনেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
তাঁদের পাশে ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মানুষও।
একুশের রক্তে শ্রীমঙ্গলের রাজপথ
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার খবর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
শহরে শুরু হয় মিছিল, সভা, পোস্টার ও প্রতিবাদ কর্মসূচি।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বড় সমাবেশ। সৈয়দ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় মো. শাহজাহান, রাসেন্দ্র দত্ত, অখিল চন্দ্র ধর, সাজ্জাদুর রহমান ও শ্রী বালাই ভট্টাচার্যসহ নেতারা বক্তব্য দেন।
ভাষার দাবি তখন আর শুধু ভাষার দাবি ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
কৃষকের অধিকারের লড়াই
ভাষা আন্দোলনের পর শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক সংগ্রাম আরও বিস্তৃত হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আনে। শ্রীমঙ্গল ও বৃহত্তর এলাকার মানুষও সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ন্যাপ গঠন করলে শ্রীমঙ্গলের অনেক তরুণ কর্মী এই দলের সঙ্গে যুক্ত হন।
এরপর ১৯৬৩ সালের বালিশিরা কৃষক অধিকার আন্দোলন শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে।
কৃষকের অধিকার ও জমি-জীবিকার প্রশ্নে আন্দোলন তীব্র হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশের কাছ থেকে ছয়টি রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১৯ বছর বয়সী সালিক ও ৮০ বছর বয়সী গনু।
ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, মো. শাহজাহান মিয়া, টিকিরিয়ার সদস্য মো. আবদুর রহিম, আবদুস খালিক, আবদুস হক ও চান মিয়া মহালদারসহ অনেকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বালিশিরার ঘটনা দেখিয়ে দেয়—শ্রীমঙ্গলের রাজনীতি শুধু জাতীয় প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকের জমি, শ্রমিকের অধিকার ও মানুষের জীবন-জীবিকাও রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
ছয় দফা থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান
১৯৬০-এর দশকে শ্রীমঙ্গলের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ সক্রিয় হয়।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং পরে ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও তীব্র করে।
১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গল থানা ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের নেতাকর্মীরা যৌথভাবে নিউবাজারে সমাবেশ করে দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা পুনরায় চালুর দাবি জানান।
১৯৬৯ সালে শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম শহীদ মিনার। পৌরসভা টাউন কমিটির মাঠের কাছে নির্মিত এই শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের শহীদদের পাশাপাশি বালিশিরা আন্দোলনে নিহত সালিক ও গনুর স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
এর মধ্য দিয়েই স্থানীয় রাজনৈতিক সংগ্রাম জাতীয় গণআন্দোলনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।
বঙ্গবন্ধুর আগমন
১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রীমঙ্গলে আসেন।
তিনি রামকৃষ্ণ মিশন রোডে ডা. মো. আবদুল আলীর বাসভবনে অবস্থান করেন।
ততদিনে শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক আবহ দ্রুত বদলে গেছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মো. ইলিয়াস ও মো. আলতাফুর রহমান চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন।
কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যায়।
১৯৭১: রাজপথ থেকে মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালের মার্চে শ্রীমঙ্গলের রাজপথ যেন এক বিশাল গণআন্দোলনের মঞ্চে পরিণত হয়।
১ মার্চ দুপুর ১টার দিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণ বেতারে প্রচারের পরপরই শ্রীমঙ্গল পৌরসভা কার্যালয় থেকে বের হয় প্রতিবাদ মিছিল।
ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, মো. শাহজাহান মিয়া ও সৈয়দ মুইজুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই মিছিল দ্রুত বড় হতে থাকে।
এরপর আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে একের পর এক মিছিল বের হয়। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে—‘জয় বাংলা’।
দাবি ওঠে সামরিক শাসনের অবসান, ছয় ও ১১ দফা বাস্তবায়ন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের।
পতাকা বদলের দিন
২৩ মার্চ শ্রীমঙ্গলের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
পরদিন ২৪ মার্চ মৌলভীবাজার থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকর্তা পতাকা পুনরায় উত্তোলন করেন।
২৫ মার্চ আবারও মানুষ পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে। পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এরপর আর পেছনে ফেরার সুযোগ ছিল না।
২৭ মার্চ রাতে শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম সংরক্ষিত অস্ত্র প্রতিরোধযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। তরুণ, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও রাজনৈতিক কর্মীরা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
২৮ মার্চ গঠিত হয় পাঁচ সদস্যের অ্যাকশন কমিটি। ফরিদ আহমদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ডা. আবদুল আলী, মুহিবুর রহমান, কমলেশ ভট্টাচার্য ও সৈয়দ মুজিবুর রহমান এতে দায়িত্ব নেন।
আনসার সদস্য ক্যাপ্টেন এম এ মুসাব্বির ও ক্যাপ্টেন মতলবসহ অনেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও মুক্তিযোদ্ধা দল সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন।
শ্রীমঙ্গলের রাজনীতি তখন আর শুধু সভা-মিছিলের মধ্যে নেই। সেটি পরিণত হয়েছে সশস্ত্র প্রতিরোধে।
যুদ্ধের আগুনে শ্রীমঙ্গল
মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে শ্রীমঙ্গল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রতিরোধ ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
২৭ মার্চ পৌরসভা কার্যালয়কে নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ৩১ মার্চ গণপরিষদ সদস্য মানিক চৌধুরী শ্রীমঙ্গলে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রশাসনিক নির্দেশনা দেন।
১ এপ্রিল মানিক চৌধুরী ও মেজর সি আর দত্ত হবিগঞ্জ থেকে একটি বড় প্রতিরোধ বাহিনী নিয়ে শ্রীমঙ্গলে আসেন।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ক্যাপ্টেন এম এ মুসাব্বির। বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণেরা যুদ্ধে যোগ দিতে শুরু করেন।
এপ্রিলের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী শ্রীমঙ্গলের দিকে অগ্রসর হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
২৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান শ্রীমঙ্গলে প্রায় আধা ঘণ্টা বোমাবর্ষণ করে। মাধবীছড়া চা-বাগানের কারখানা, রেশন দোকান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান কয়েকজন সাধারণ মানুষ।
এর মাত্র দুই দিন পর, ৩০ এপ্রিল, পাকিস্তানি সেনারা শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে।
৩০ এপ্রিল: রক্তাক্ত এক দিন
পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশের পর শুরু হয় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্যাতন।
ভুনবীর ইউনিয়নে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মির্জাপুর চা-বাগানের প্রধান সহকারী অঘোর ভট্টাচার্যকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।
নারায়ণছড়া চা-বাগানের মোস্তফা আলম ও তাঁর জামাতাকেও হত্যা করা হয়।
রাজঘাটের চা-শ্রমিক নেতা পাবন তাঁতি এবং ফুসকুড়ি চা-বাগানের শম্ভু সিংহসহ বহু মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ভাড়াউড়া এলাকায়। চা-বাগানের ৪৫ জন শ্রমিককে একত্র করে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
চা-শ্রমিকদের সেই রক্ত শ্রীমঙ্গলের মাটিতে মিশে যায়।
বধ্যভূমি ও গণকবরের নীরব সাক্ষ্য
মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন স্থান পরিণত হয়েছিল হত্যা ও নির্যাতনের কেন্দ্রে।
ওয়াপদা রেস্ট হাউস, ডাকবাংলো ও তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী ঘাঁটি স্থাপন করে।
আটক করা হতো মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে। নির্যাতনের পর অনেককে হত্যা করা হয়।
পূর্বাশা এলাকায় কয়েকজন তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভাড়াউড়া, পূর্বাশা আবাসিক এলাকা এবং তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরের কাছাকাছি সাধুবাবার বটগাছসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবর ও হত্যার স্মৃতি আজও রয়েছে।
এসব স্থান শ্রীমঙ্গলের জন্য শুধু স্মৃতিচিহ্ন নয়—এগুলো একটি জাতির স্বাধীনতার মূল্য কতটা রক্তে লেখা হয়েছিল তার নীরব সাক্ষ্য।
প্রতিরোধের শেষ অধ্যায়
পাকিস্তানি বাহিনীর দখলদারিত্বের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ থেমে থাকেনি।
বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অভিযান চালানো হয়। বিলাশ সেতুকে কেন্দ্র করে অভিযানের পরিকল্পনাও করা হয়।
ভুনবীর এলাকায় গঙ্গেশ দেব রায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া একদল মুক্তিযোদ্ধার ওপরও পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হামলা চালায়।
সামির সোম, মঈনউদ্দিন, শম্ভু নায়ক ও অর্জন পোদ্দারসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষ ধরা পড়ে নির্মমভাবে নিহত হন।
অক্টোবর-নভেম্বরজুড়ে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। একদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দমন-পীড়ন, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণ—শ্রীমঙ্গলের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর দিন।
৪ ডিসেম্বর: মুক্ত শ্রীমঙ্গল
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল মুক্ত হয়।
ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রীমঙ্গল ছিল ৪ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর সি আর দত্ত।
৪ ডিসেম্বরের মুক্তির মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গলের মানুষ ফিরে পায় স্বাধীনতার স্বাদ।
কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি থেকে যায় অসংখ্য মানুষের হারানোর বেদনা।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গল
শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে একটি ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিদেশি পণ্য বর্জন থেকে শুরু করে বিপ্লবী রাজনীতি; কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ভাষা আন্দোলন; ভাষার অধিকার থেকে কৃষকের অধিকার; ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধ—প্রতিটি আন্দোলন পরবর্তী আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করেছে।
এই ইতিহাসের নায়ক শুধু জাতীয় পর্যায়ের নেতারা নন।
এখানে নায়ক সেই ছাত্র, যে মিছিলের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
সেই কৃষক, যে জমির অধিকারের জন্য পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
সেই চা-শ্রমিক, যার ঘামে শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।
সেই পরিবার, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিল।
সেই তরুণ, যে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
আর সেই সাধারণ মানুষ, যে ভয়কে জয় করে স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
স্মৃতি সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি
আজ শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন মানুষ আসে চা-বাগান দেখতে, মাধবপুর লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে, সাত রঙা চায়ের স্বাদ নিতে কিংবা রাজকান্দির বনের পথে হাঁটতে।
কিন্তু পর্যটনের এই পরিচয়ের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসও তুলে ধরা জরুরি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বালিশিরা কৃষক আন্দোলনের স্থান, ১৯৭১-এর বধ্যভূমি ও গণকবর, পুরোনো রাজনৈতিক সংগঠনের দলিল, শহীদদের নাম এবং মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
পুরোনো দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও মৌখিক ইতিহাস ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা এবং একটি স্থানীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও সময়ের দাবি।
কারণ যে জনপদ তার ইতিহাস ভুলে যায়, সে তার ভবিষ্যতের একটি অংশও হারায়।
শেষ কথা
শ্রীমঙ্গলের সবুজ চা-বাগান আজ পর্যটকের চোখে সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু সেই সবুজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের গল্প, রক্তের গল্প, সংগ্রামের গল্প।
এই জনপদের রেলস্টেশন দেখেছে জাতীয় নেতাদের আগমন। স্কুলের মাঠ দেখেছে ভাষার দাবিতে তরুণদের মিছিল। বাজার দেখেছে রাজনৈতিক সমাবেশ। কৃষকের জমি দেখেছে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। আর ১৯৭১-এর মাটি ধারণ করেছে অসংখ্য শহীদের রক্ত।
তাই শ্রীমঙ্গলকে শুধু ‘চায়ের রাজধানী’ বলে পরিচয় করিয়ে দিলে তার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
শ্রীমঙ্গল—চায়ের রাজধানী, কিন্তু তার গভীরে এটি প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও সাহসের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের জনপদ।
এই ইতিহাস শুধু অতীতের নয়; এটি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি দায়বদ্ধতার নাম—
যে ইতিহাস জানা, সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।