৪২ বছর ধরে গণিতের পাঠ,আর মনুষ্যত্বের শিক্ষা আলহাজ্ব মো. সিরাজুল ইসলাম কোরেশী (কোরেশী স্যার)

প্রতিবেদন ,আমার শ্রীমঙ্গল:
   “প্রকৃত শিক্ষা শুধু ভালো ফলের মধ্যে নয়, বরং মানুষের মতো মানুষ হওয়ার ও মানবিকতাবোধ জাগিয়ে তোলার মাঝে নিহিত।” — আলহাজ্ব মো. সিরাজুল ইসলাম কোরেশী

এক নজরে কোরেশী স্যার

  • পূর্ণ নাম: আলহাজ্ব মো. সিরাজুল ইসলাম কোরেশী (কোরেশী স্যার)

  • জন্ম: ১৯৪৮ সাল (রাজনগর, মৌলভীবাজার)

  • শিক্ষাজীবন: মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ও সিলেট এমসি কলেজ (বিএসসি)

  • পেশাগত জীবন: দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর শিক্ষকতা (রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয় এবং শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়)

  • বিশেষ পরিচিতি: গণিত ও জীববিজ্ঞানের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, সিলেট ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষক ও নিরীক্ষক

    শিক্ষকতার শুরু ও আলোর পথচলা

    একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই মহান দায়িত্ব নিষ্ঠা, সততা ও ভালোবাসার সঙ্গে পালন করে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে আলোর দিশা দেখিয়েছেন আলহাজ্ব মো. সিরাজুল ইসলাম কোরেশী।

    ১৯৪৮ সালে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার তাহার লামুয়া গ্রামে এক শিক্ষক পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মরহুম মো. মহিউদ্দীন কোরেশী ছিলেন শিক্ষক এবং মাতা ফজিলুতুন্নেছা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শিক্ষার পরিবেশেই বেড়ে ওঠা কোরেশী স্যারের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে জ্ঞান অর্জন ও তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

    খলাগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর সিলেট এমসি কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ১৯৭২ সালে রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শিক্ষকতা পেশাকে আরও সমৃদ্ধ করতে ১৯৮০ সালে কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি যোগ দেন শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে দীর্ঘ ৩৪ বছর—১৯৮০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত—গণিত ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করেন।

    গণিতের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের প্রিয় মুখ

    গণিত বিষয়ে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। কঠিন গণিতকে সহজভাবে বোঝানোর অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। যে বিষয়টি অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ভয়ের কারণ ছিল, কোরেশী স্যারের কাছে সেটিই হয়ে উঠত সহজ ও আনন্দময়।

    শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, সিলেট ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের গণিত বিষয়ের পরীক্ষক ও নিরীক্ষক হিসেবেও তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে শিখেছে সময়ের মূল্য, শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষ হিসেবে ভালো হওয়ার শিক্ষা।

    পারিবারিক জীবন ও আদর্শ

    ব্যক্তিগত জীবনেও কোরেশী স্যারের পাশে ছিলেন একজন শিক্ষিকা। তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা রাশেদা আক্তারও একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পরিবারে রয়েছে গর্ব করার মতো সাফল্যের গল্প। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে—

    • বড় ছেলে: মো. কাজেম আল কোরেশী (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)

    • কন্যা: নুজহাত কোরেশী নিশাত (গৃহিণী)

    • কনিষ্ঠ পুত্র: মো. নাজেম আল কোরেশী রাফাত (সফল চিকিৎসক)

      তরুণ প্রজন্মের প্রতি স্যারের বার্তা

      দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কোরেশী স্যারের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

      “প্রিয় তরুণ সমাজ, জীবনটা গণিতের মতোই নানা জটিল সমীকরণে ভরা। তবে সততা, কঠোর পরিশ্রম আর নৈতিকতার সঠিক সূত্র ব্যবহার করলে যেকোনো কঠিন সমস্যার সমাধান সম্ভব।”

      তিনি আরও বলেন, তরুণদের কখনো নিজেদের শিকড়, মা-বাবা ও শিক্ষকদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। মেধার সঙ্গে দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটিয়ে সমাজ ও দেশের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করার আহ্বান জানান তিনি।

      উপসংহার

      সময় বদলায়, শিক্ষাপদ্ধতি বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। কোরেশী স্যারের জীবন সেই সত্যেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর শিক্ষার্থীদের কর্ম, সাফল্য ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই আলোর প্রদীপ আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্বেলে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *