হাইল হাওরের কান্নার শব্দ

বিপন্ন শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যভাণ্ডার, হারিয়ে যাচ্ছে ৪৫ প্রজাতির দেশীয় মাছ

নিজস্ব প্রতিবেদক, শ্রীমঙ্গল ভোরের আলো ফোটার আগেই যে হাওরের বুক চিরে ভেসে আসত ‘আলী… আলী…’ হাঁকডাক, মাছের ঝাঁকের ছপছপ শব্দ আর জেলেদের ব্যস্ততার রূপালী উৎসব—সেই হাইল হাওর আজ যেন এক নিথর নীরবতার প্রান্তর। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চোখজুড়ানো এই ঐতিহাসিক হাইল হাওর একসময় ছিল দেশীয় প্রজাতির মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার। তবে কালের বিবর্তনে, প্রকৃতির ক্ষয় আর মানুষের নির্বিচার নিধনে আজ হাওর থেকে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় রূপালী সম্পদ।

একসময় হাইল হাওরের পানি স্পর্শ করলেই মিলত মহাশোল, বাঘাইড়, নান্দিনা, চিতল, পাবদা কিংবা রিঠার দেখা। স্থানীয় প্রবীণ জেলে ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইল হাওরে একসময় প্রায় ১০০ প্রজাতির দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু সঠিক তদারকি ও সচেতনতার  এর মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ প্রজাতির মাছ আজ হয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত, না হয় চরম বিপন্নতার মুখোমুখি। জালের সূক্ষ্ম ফাঁদে আটকা পড়ে কিংবা পানির গভীরতা হারিয়ে প্রজাতিগুলো আজ কেবল মৎস্য বইয়ের পাতার চিত্রে রূপ নিচ্ছে।

সেচ আর চায়না দুয়ারির কোপ

স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাওরের রূপালী সম্পদ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বিল সেচে মাছ ধরা’। শীতের শেষে শুকনো মৌসুমে ইজারাদার ও অসচেতন জেলেরা সেচ পাম্প বসিয়ে হাওরের গভীর কুয়া ও বিলের শেষ ফোঁটা পানি পর্যন্ত শুকিয়ে ফেলে। ফলে প্রজননক্ষম মা-মাছ এবং ক্ষুদ্র পোনা—কোনোটিই রেহাই পায় না। বংশরক্ষার শেষ প্রদীপটুকুও এভাবে নিভে যায়।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে অবৈধ জালের দৌরাত্ম্য। কারেন্ট জাল তো ছিলই, ইদানীং যুক্ত হয়েছে অতি সূক্ষ্ম ‘চায়না দুয়ারি’ বা চাইনিজ বাইর। এই জালে মাছের ডিম থেকে শুরু করে অতি ক্ষুদ্র পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে।

“আগে এক ক্ষ্যাপ জাল বালেই নৌকা ভরে যেত চিতল আর পাবদায়। এহন সারাদিন জাল বায়াও পানের খোরাকি উঠে না। শুকনা মৌসুমে কুয়া সেইচ্ছা ছোট-বড় সব মাছ ধইরা ফালায়, মাছের ছাও বড় হওয়ার সুযোগই পায় না।”— আব্দুল জলিল (৬৫), প্রবীণ জেলে, হাইল হাওর এলাকা।

ভরাট হচ্ছে তলদেশ, বিষাক্ত হচ্ছে পানি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে প্রচুর পলি এসে হাইল হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় বর্ষা শেষে হাওর দ্রুত শুকিয়ে যায়, যা মাছের স্বাভাবিক অভয়াশ্রম ও প্রজনন ক্ষেত্রকে বিনষ্ট করছে।

পাশাপাশি হাওর সংলগ্ন কৃষিজমি ও চা বাগানে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির জলে ধুয়ে হাওরে মিশে পানির গুণাগুণ নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মাছের স্বাভাবিক যাতায়াতের পথগুলো (ছড়া ও খাল) রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণের ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বাইক্কা বিল: আশার আলো কি টিকবে?

এত হতাশার মধ্যেও আশার আলো জ্বেলেছে হাইল হাওরের প্রাণকেন্দ্র ‘বাইক্কা বিল’। ২০০৩ সালে এটিকে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করার পর দেখা গেছে প্রজনন মৌসুমে মা-মাছ ও পোনা নিরাপদ আশ্রয় পেলে দেশীয় মাছ আবারও ফিরে আসতে পারে। বাইক্কা বিলে চিতল, গজার, পাবদা ও গুলশার মতো কিছু বিলুপ্তপ্রায় মাছের পুনর্জাগরণ সেই সত্যই প্রমাণ করে।

তবে কেবল একটি বাইক্কা বিল দিয়ে পুরো হাইল হাওরের জীববৈচিত্র্য ধরে রাখা অসম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

সমাধান কোথায়?
​হাইল হাওরের দেশীয় মাছের ঐতিহ্য ফেরাতে হলে কঠোর হাতে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, শুকনো মৌসুমে বিল সেচ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং হাওরের প্রাকৃতিক সংযোগ খালগুলো পুনর্খনন করতে হবে।
​হাইল হাওর কেবল একটি জলাশয় নয়, এটি হাজারো জেলের জীবিকা এবং সিলেটের মৎস্য ঐতিহ্যের হৃদস্পন্দন। এই হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হওয়ার আগেই যদি সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনবে—একসময় হাইল হাওরে মাছের মেলা বসত।

এক নজরে হাইল হাওর  

বিষয় / সূচক তথ্য ও বিবরণ
🐟 ঐতিহাসিক মাছের প্রজাতি ৯৮–১০০টি (অতীতে হাওরে অবাধ বিচরণ ছিল)
🚨 বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতি ৩০–৪৫টি (বর্তমানে বিলুপ্ত বা চরম সংকটাপন্ন)
🐠 প্রধান বিলুপ্তপ্রায় মাছ মহাশোল, বাঘাইড়, নান্দিনা, চিতল, পাবদা, রিঠা, বাচা
⚠️ প্রধান সংকট সেচ পাম্পে বিল সেচ, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল, পলি জমা এবং নদী-ছড়া ভরাট
🟢 একমাত্র আশার আলো বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়াশ্রম (২০০৩ সাল থেকে কার্যকর)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *